আমরা কোনো সংগঠনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
শুরু কথা: আমরা কী ভাবছি এবং কেন?
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কয়েকটি ভবন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমষ্টি নয়। একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে তখনই, যখন তার শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার, দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং প্রয়োজনের সময় শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের কথা বলতে পারে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সময় নানা সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা থাকা যতটা স্বাভাবিক, তার সমাধানের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের অনেকের নিজস্ব দাবি আছে — কারও একাডেমিক, কারও প্রশাসনিক, কারও ক্যাম্পাস-সংক্রান্ত, আবার কোনোটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রশ্ন হলো:
- এই দাবিগুলো কীভাবে একত্র হবে?
- একজন শিক্ষার্থীর কথা কীভাবে তার সহপাঠীদের কাছে পৌঁছাবে?
- একটি সেশনের কথা কীভাবে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের কাছে যাবে?
- একটি ক্যাম্পাসের সমস্যা কীভাবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায় আসবে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ব, যেখানে একজন শিক্ষার্থী একা নয়; বরং তার সহপাঠী, সেশন, ক্যাম্পাস ও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে নিজের কথা বলতে পারে? এই প্রস্তাবের মূল চিন্তা এখানেই।
ইচ্ছা থাকলেই দাবি আদায় হয় না; দাবিকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন ও এগিয়ে নিতে একটি কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন।
তবে এই কাঠামো কোনো আলাদা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংগঠন তৈরির জন্য নয়। আমাদের স্বপ্ন ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা। এই কাঠামো শিক্ষার্থীদের মধ্যকার যোগাযোগ, পরামর্শ, প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয়ের একটি ব্যবস্থা মাত্র।
১. বড় সংখ্যাকে সংগঠিত করার সহজ যুক্তি
একজন মানুষ একসঙ্গে চল্লিশ হাজার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে না। কিন্তু নিজের শ্রেণিকক্ষের সহপাঠীদের সঙ্গে খুব সহজেই পারে।
একজন শিক্ষার্থী হয়তো বিভাগের শত শত শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। কিন্তু নিজের সেশনের শিক্ষার্থীদের চেনে — একই শ্রেণিকক্ষে বসে, একই শিক্ষকদের ক্লাস করে, একই পরীক্ষা দেয় এবং প্রতিদিনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে।
অর্থাৎ বড় শিক্ষার্থীসমাজের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়তে হলে তার ভেতরে এমন কিছু ছোট ও পরিচিত যোগাযোগকেন্দ্র থাকা দরকার, যার মাধ্যমে তথ্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে ছড়ায়। এটি কোনো জটিল তত্ত্ব নয়, সাধারণ বোধের বিষয়। বড় শিক্ষার্থীসমাজকে ছোট ছোট পরিচিত ইউনিটের মাধ্যমে সংযুক্ত করা গেলে:
- যোগাযোগ সহজ হয়;
- তথ্য হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে;
- প্রত্যেক স্তরে দায়িত্ব নির্ধারণ করা যায়;
- সমস্যার উৎস চিহ্নিত করা সহজ হয়;
- শিক্ষার্থীদের মতামত একত্র করা যায়;
- সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির তথ্য দ্রুত পৌঁছানো যায়;
- কর্মসূচির পর কী ঘটেছে, সেটিও মূল্যায়ন করা যায়।
তাই আমাদের প্রশ্ন শুধু “বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষার্থী?” নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
“এই শিক্ষার্থীরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে?”
২. সমন্বয় শৃঙ্খল: যোগাযোগের একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা
এই ধারণাটিকে বলা যেতে পারে “সমন্বয় শৃঙ্খল”। এখানে “শৃঙ্খল” মানে কাউকে কারও অধীনস্থ করা নয়। এর অর্থ: কোনো তথ্য, মতামত, সিদ্ধান্ত বা সমস্যা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার পথে যেন হারিয়ে না যায়, তার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের পথ।
এই ব্যবস্থা দুই দিকেই কাজ করবে:
- উপর থেকে নিচে: সিদ্ধান্ত → কর্মসূচির তথ্য → প্রয়োজনীয় নির্দেশনা → প্রতিটি ইউনিট → শিক্ষার্থী
- নিচ থেকে উপরে: শিক্ষার্থীর মতামত → ইউনিট → বৃহত্তর সমন্বয় → প্রস্তাব → সিদ্ধান্ত গ্রহণ
অর্থাৎ এটি একমুখী নয়, দ্বিমুখী যোগাযোগব্যবস্থা। সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেই কাজ শেষ নয়; শিক্ষার্থীরা কী ভাবছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কী পরিবর্তন দরকার — সেটিও আবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে ফিরে আসতে হবে।
৩. আমরা আগে শিক্ষার্থী — আর সমন্বয় মানে নেতৃত্ব নয়
এই কথাটি পুরো কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। আমরা আলাদা সংগঠন বানিয়ে কিছু মানুষকে “নেতা” আর বাকিদের “সদস্য” হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা সবাই প্রথমত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
কেউ সমন্বয়ের দায়িত্ব নিতে পারে, কেউ লিখতে পারে, কেউ ডিজাইন করতে পারে, কেউ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, কেউ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে, কেউ অনলাইনে কাজ করতে পারে — কিন্তু সবার মূল পরিচয় এক। তাই এই কাঠামো ক্ষমতার নয়; এটি যোগাযোগ ও সহযোগিতার কাঠামো।
আমাদের মূলনীতি: “We are all equal.” আরও পরিষ্কারভাবে:
“আমরা সবাই সমান; দায়িত্ব আলাদা হতে পারে, মর্যাদা নয়।”
কেউ কোনো স্তরে যোগাযোগের দায়িত্বে থাকলেই সে অন্যদের নেতা নয়। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ কর্তৃত্ব করা নয়; তার কাজ হবে:
- তথ্য পৌঁছে দেওয়া ও কর্মসূচির তথ্য জানানো;
- সহপাঠীদের মতামত শোনা;
- প্রয়োজনীয় তথ্য পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া;
- নিজের ইউনিটের বাস্তব পরিস্থিতি জানানো;
- প্রয়োজনে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করা।
দায়িত্বশীল মানে নেতা নয়; দায়িত্বশীল মানে সেবক, সহপাঠী ও সমন্বয়কারী।
নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো — তার দায়িত্ব কী এবং তার ক্ষমতার সীমা কোথায়। (নাম কী হবে, সেটি আলোচনার বিষয়।)
৪. আমাদের কাঠামোর মূলনীতি
- সমতা — দায়িত্ব পাওয়ার কারণে কেউ অন্যের চেয়ে বেশি মূল্যবান হবে না।
- প্রতিনিধিত্ব — প্রত্যেক সেশন ও শিক্ষার্থীসমাজের মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
- অংশগ্রহণ — যে শিক্ষার্থী যেভাবে অবদান রাখতে সক্ষম, সে সেভাবেই অংশ নিতে পারবে।
- জবাবদিহি — যে দায়িত্ব নেবে, তার কাজের মূল্যায়নও করা যাবে।
- স্বচ্ছতা — গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, প্রস্তাব, কর্মসূচি ও প্রতিনিধিত্বের তথ্য যথাসম্ভব স্বচ্ছ থাকবে।
- মতামতের স্বাধীনতা — সবাইকে একই মতের করা নয়; ভিন্ন মতকে আলোচনার কার্যকর জায়গা দেওয়া।
- শান্তিপূর্ণতা — দাবি ও কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, আইনসম্মত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখার চেষ্টা।
- পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত — একজনের চিন্তার ওপর নির্ভর না করে বহু মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ যুক্ত করা।
একটি মাথা একটি বিষয়ে যতটা ভাবতে পারে, দশটি মাথা আলোচনা করলে আরও বেশি দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরামর্শ, আলোচনা ও সম্মিলিত চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ইসলামী চিন্তায় শূরা বা পরামর্শের নীতিও এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
“আমার সিদ্ধান্ত” নয়; প্রয়োজনে “আমাদের পরামর্শে নেওয়া সিদ্ধান্ত”।
৫. ইতিহাস থেকে একটি শিক্ষা: যোগাযোগ ও সংগঠন কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইতিহাসের বিভিন্ন গণআন্দোলন বিশ্লেষণ করলে বারবার দেখা যায় — শুধু অসন্তোষ বা দাবি থাকলেই কোনো আন্দোলন দীর্ঘ সময় চলে না। মানুষকে যোগাযোগ করতে হয়েছে, তথ্য আদান-প্রদান করতে হয়েছে, নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: সেক্টর ভাগ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি সেক্টরে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার, ভেতরে ছিল আরও ছোট সাব-সেক্টর, আর উপরে ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ফলে বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা মানুষ একই লক্ষ্যে নিজ নিজ এলাকার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পেরেছিল।
শিক্ষা: বড় সংখ্যাকে ছোট ছোট দায়িত্বশীল এককে ভাগ করলে সমন্বয় সহজ হয়, আর প্রতিটি এককের দায়িত্ব স্পষ্ট থাকে।
মন্টগোমারি বাস বয়কট (যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৫৫–৫৬)
প্রায় ১৩ মাস (৩৮১ দিন) ধরে হাজার হাজার মানুষ বাসে না চড়ে হেঁটে ও গাড়ি ভাগাভাগি করে যাতায়াত করেছিলেন। এটি সম্ভব হয়েছিল স্থানীয় সংগঠন, গির্জা ও নিয়মিত সভার মাধ্যমে প্রতিদিনের পরিবহন, তথ্য ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার কারণে।
শিক্ষা: প্রত্যেকের ছোট ছোট ভূমিকা মিলেই বড় ফল আসে।
ইউনিটভিত্তিক কাঠামো: সুসংগঠিত বাহিনীর উদাহরণ
বিশ্বের অধিকাংশ সুসংগঠিত বাহিনী ক্ষুদ্র ইউনিট থেকে ধাপে ধাপে উপরের স্তর পর্যন্ত সংযুক্ত কাঠামোতে চলে; প্রতিটি স্তরে একজন দায়িত্বশীল থাকে, নির্দেশ নিচে যায়, তথ্য উপরে ওঠে। আমাদের উদ্দেশ্য সামরিক পথ অনুসরণ করা নয়; শুধু সাংগঠনিক নীতিটি শেখা।
শিক্ষা: ছোট ইউনিটের শক্তি, স্পষ্ট দায়িত্ব এবং উপর থেকে নিচ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন সংযোগ।
এখানে আমাদের জন্য শিক্ষা কোনো আন্দোলনকে অনুকরণ করা নয়। সাধারণ শিক্ষা হলো: বড় সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির পাশাপাশি তাদের মধ্যে যোগাযোগের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন, তাই নিজেদের শিক্ষার্থী, সেশন, বিভাগ ও ক্যাম্পাসের বাস্তবতার ভিত্তিতেই কাঠামো গড়তে হবে।
৬. ২৭ সেপ্টেম্বরের অভিজ্ঞতা: একটি রবিবার আমাদের কী শিখিয়েছে
২৭ সেপ্টেম্বরের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
- উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। তথ্য সময়মতো না পৌঁছানো, পর্যাপ্ত প্রচার না থাকা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ না থাকার মতো কারণ থাকতে পারে।
- তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছিল না। অনেক শিক্ষার্থী জানতে পারেনি কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কীভাবে অংশ নেবে।
- বিবৃতিতে অসামঞ্জস্য ছিল। একই আন্দোলনের বিবৃতির ভাষা ও বক্তব্যে পার্থক্য থাকায় বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
- অনলাইনে কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা ছিল না। কর্মসূচির আগে, চলাকালে বা পরে নির্ভরযোগ্য অনলাইন নথি খুঁজে পাওয়া কঠিন।
- একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছিল না। দাবি, অবস্থান ও কর্মসূচি জানার একটি কেন্দ্রীয় সূত্র না থাকায় বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শুধু কর্মসূচি নেওয়া যথেষ্ট নয়; তথ্য কীভাবে পৌঁছাবে, বক্তব্য কীভাবে এক থাকবে এবং কার্যক্রম কীভাবে নথিভুক্ত ও দৃশ্যমান থাকবে — সেটিও আগে থেকে নিশ্চিত করতে হবে।
তাই ব্যক্তিগত মতামতের স্বাধীনতা বজায় রেখেও কোনো অভিন্ন কর্মসূচি বা দাবির ক্ষেত্রে যাচাই করা তথ্য ও একটি সুস্পষ্ট মূল বক্তব্য থাকা দরকার।
এই অভিজ্ঞতাকে আমরা কারও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখি না; দেখি একটি সাংগঠনিক শিক্ষা হিসেবে। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাঠামো উন্নত করাই একটি পরিণত শিক্ষার্থী আন্দোলনের লক্ষণ।
৭. আমাদের বাস্তবতা: আমরা কত বড়?
আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষার্থীসমাজ। এর আকার বোঝার জন্য কাঠামোগত একটি হিসাব ধরা হচ্ছে। নিচের অ্যানিমেশনে সেটিই ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে, আর তার নিচে একই কথা লেখায় দেওয়া হলো।
ধাপে ধাপে হিসাব
ধাপ ১: ৭টি ক্যাম্পাস। সাতটি ক্যাম্পাস হলো — সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঈডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।
ধাপ ২: প্রতি ক্যাম্পাসে ২০টি বিভাগ। প্রতিটি ক্যাম্পাসে গড়ে ২০টি বিভাগ ধরা হচ্ছে।
ধাপ ৩: প্রতি বিভাগে ৫টি সেশন। প্রতিটি বিভাগে একসঙ্গে পাঁচটি সেশনের শিক্ষার্থী পড়ছে ধরা হচ্ছে।
ধাপ ৪: মোট ইউনিট। একটি বিভাগের একটি সেশনই আমাদের সর্বনিম্ন ইউনিট। তাহলে:
৭ ক্যাম্পাস × ২০ বিভাগ × ৫ সেশন = ৭০০টি ইউনিট
অর্থাৎ প্রতি ক্যাম্পাসে ২০ × ৫ = ১০০টি ইউনিট, আর সাতটি ক্যাম্পাসে ১০০ × ৭ = ৭০০টি। অ্যানিমেশনের প্রতিটি সবুজ বিন্দু একটি বিভাগের একটি সেশন, অর্থাৎ একটি ইউনিট।
ধাপ ৫: শিক্ষার্থী। পুরো শিক্ষার্থীসমাজের আনুমানিক পরিসর প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থী।
দায়িত্বশীলের সংখ্যা
প্রতিটি ইউনিটে সর্বনিম্ন ৩ জন দায়িত্বশীল ধরলে:
- প্রতি ক্যাম্পাসে: ১০০ ইউনিট × ৩ জন = কমপক্ষে ৩০০ জন;
- পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে: ৩০০ জন × ৭ ক্যাম্পাস = কমপক্ষে ২,১০০ জন।
এই ২,১০০ জন প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক হবেন — মানে প্রতি ১৯ জনের মতো শিক্ষার্থীর জন্য একজন সহপাঠী, যিনি তথ্য পৌঁছে দেবেন ও মতামত ফিরিয়ে আনবেন।
দুটি সংখ্যা এক নয়
- ৭০০ ইউনিট হলো কাঠামোগত হিসাব — কতগুলো যোগাযোগকেন্দ্র থাকবে।
- প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থী হলো সামগ্রিক শিক্ষার্থীসমাজের আনুমানিক পরিসর।
দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়। প্রতি সেশনে ৮০–৯০ জন শিক্ষার্থীর ধারণা একটি সাধারণ উদাহরণ মাত্র, কারণ প্রতিটি বিভাগ ও সেশনের আকার এক নয়। এই হিসাব একটি প্রস্তাবিত/আনুমানিক কাঠামো; বাস্তবায়নের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত বিভাগ ও সেশনের সংখ্যা যাচাই করে চূড়ান্ত হিসাব করা উচিত।
৩ জন কোনো বাধ্যতামূলক সংখ্যা নয়। কোনো ইউনিটে আরও বেশি শিক্ষার্থী দায়িত্ব নিতে চাইলে তাদের যুক্ত করা যাবে। উদ্দেশ্য নতুন পদ তৈরি নয় — আরও বেশি শিক্ষার্থীকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত করা।
৮. একটি ইউনিটের মূল দর্শন
একটি ইউনিট মানে শুধু একটি তালিকা নয়।
পরিচিত মানুষ + নিয়মিত যোগাযোগ + পারস্পরিক আস্থা + দায়িত্ব
উদাহরণ — নিচের প্রতিটি সংযোজন একেকটি আলাদা ইউনিট:
- বাংলা কলেজ → দর্শন বিভাগ → ২০২৫–২৬ সেশন
- বাংলা কলেজ → বাংলা বিভাগ → ২০২৫–২৬ সেশন
- ঢাকা কলেজ → পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ → ২০২৫–২৬ সেশন
ইউনিটের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখবে। তাদের কাজ অন্য সেশনকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; প্রথম দায়িত্ব নিজেদের সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। এভাবে প্রতিটি বিভাগ ও সেশন নিজেদের একটি পরিচিত যোগাযোগকেন্দ্র পাবে।
৯. কেন একটি বিভাগের একটি সেশনই সর্বনিম্ন ইউনিট?
পুরো বিভাগকে সর্বনিম্ন ইউনিট না করে কেন একটি বিভাগের একটি সেশনকে করা হচ্ছে? এর উত্তর আমাদের প্রতিদিনের শিক্ষাজীবনেই আছে। একটি সেশন এমন একটি শিক্ষার্থীসমাজ, যেখানে মানুষ একে অপরকে সবচেয়ে কাছ থেকে চেনে। একটি সেশনের শিক্ষার্থীরা:
- একই শ্রেণিতে পড়ে ও একই সময়ে ক্লাস করে;
- একই শিক্ষকদের ক্লাস করে ও একই পরীক্ষায় অংশ নেয়;
- নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে দেখা করে;
- অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে।
তাই সেশন একটি স্বাভাবিক ও কার্যকর প্রাথমিক যোগাযোগকেন্দ্র। কোনো বিষয় জানতে চাইলে একজন শিক্ষার্থীকে অচেনা কাউকে খুঁজতে হবে না; সে নিজের সহপাঠীর কাছেই জানতে পারবে। এখানেই ইউনিটের শক্তি।
আমরা এমন যোগাযোগকেন্দ্র চাই, যেখানে তথ্য পৌঁছানোর জন্য প্রথমে সেই মানুষগুলোর কাছে যাওয়া যায়, যারা একে অপরকে ইতিমধ্যে চেনে।
১০. একটি ইউনিটের বাস্তব শক্তি কোথায়?
ধরা যাক, একটি ইউনিটে ৮০–৯০ জন শিক্ষার্থী। সেখানে তিনজন দায়িত্বশীলও ৮০–৯০ জনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের “নিয়ন্ত্রণ” করা নয়; বরং তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং মতামত ফিরিয়ে আনা।
কোনো কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও অবদানের পথ শেষ হয়ে যায় না। একজন শিক্ষার্থী তথ্য যাচাই করতে পারে, লেখা লিখতে পারে, নকশা বা ভিডিও তৈরি করতে পারে, অনলাইন যোগাযোগে সহায়তা করতে পারে, তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করতে পারে, অথবা সহপাঠীদের মধ্যে তথ্য পৌঁছে দিতে পারে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণের অর্থ শুধু মাঠে উপস্থিত থাকা নয়। প্রত্যেকের সক্ষমতা আলাদা, তাই অবদানের পথও আলাদা হতে পারে।
১১. হাইব্রিড কাঠামো: কেন্দ্রীয় ঘোষণা ও ইউনিটভিত্তিক যোগাযোগ
আমাদের কাঠামো এমন নয় যে প্রতিটি তথ্যকে বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্র → ক্যাম্পাস → বিভাগ → সেশন — এই চার ধাপ পার হয়েই শিক্ষার্থীর কাছে যেতে হবে। যোগাযোগব্যবস্থা হবে হাইব্রিড।
নতুন কর্মসূচির প্রস্তাব এলে প্রথমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আলোচনা হবে, প্রয়োজনে মতামত নেওয়া হবে। প্রস্তাব গৃহীত হলে চূড়ান্ত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে প্রস্তুত হবে। তারপর একই তথ্য একাধিক মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে:
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট;
- Facebook page ও Facebook group;
- Messenger community;
- অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম;
- এবং সরাসরি ইউনিটগুলোর কাছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হবে দ্রুত গণযোগাযোগের মাধ্যম; ইউনিট কাঠামো হবে নির্ভরযোগ্য সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম।
কেউ পোস্ট দেখে জানতে পারবে; কেউ পোস্ট না দেখলেও তার ইউনিটের দায়িত্বশীলের কাছ থেকে জানতে পারবে। আবার ইউনিটের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, মতামত ও বাস্তব পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ফিরে আসতে পারবে। এটাই হাইব্রিড যোগাযোগব্যবস্থা।
১২. একটি স্মারকলিপি ও স্বাক্ষর সংগ্রহের উদাহরণ
ধরা যাক, শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক দাবির পক্ষে স্মারকলিপি তৈরি হয়েছে এবং সমর্থন ও স্বাক্ষর সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাজটি কোনো একটি ক্যাম্পাস বা বিভাগের ওপর নির্ভর করবে না।
- প্রস্তাব নির্ধারিত পদ্ধতিতে আলোচনা ও গ্রহণ করা হবে।
- কেন্দ্রীয় ঘোষণা + সোশ্যাল মিডিয়া + সরাসরি ইউনিটে তথ্য — তিনটি পথ একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে।
- ইউনিটের দায়িত্বশীলরা সহপাঠীদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন।
- শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় সমর্থন বা স্বাক্ষর দেবেন।
- ইউনিটে সংগৃহীত তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।
ইউনিটের কাজ কাউকে সিদ্ধান্তে বাধ্য করা নয়; বরং তথ্য পৌঁছে দেওয়া, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং যারা স্বেচ্ছায় অংশ নিতে চান তাদের সুযোগ করে দেওয়া।
এতে বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন দুটোই সহজ হয়: কোন ইউনিট থেকে কতজন অংশ নিল? কোথায় অংশগ্রহণ বেশি, কোথায় কম? কোথায় তথ্য পৌঁছাতে সমস্যা হলো? কোথায় ভিন্নমত এল? এখানে সংখ্যা মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার নয়; বরং কাজের বাস্তব অবস্থা বোঝার তথ্য।
১৩. কর্মসূচির পর মূল্যায়ন: এখানেই আন্দোলন পরিণত হয়
কর্মসূচি শেষ হলে কাজ শেষ হয় না; সেখান থেকেই পরবর্তী কাজের প্রস্তুতি শুরু হয়। ধরা যাক, ৮৫ জনের একটি ইউনিট থেকে ৩০ জন অংশ নিয়েছে, আর অন্য ৮৫ জনের ইউনিট থেকে নিয়েছে ৫ জন। শুধু এই সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। প্রশ্ন করতে হবে:
- তথ্য কি সময়মতো পৌঁছেছিল?
- কর্মসূচির উদ্দেশ্য কি পরিষ্কার ছিল?
- শিক্ষার্থীরা কি বিষয়টির সঙ্গে একমত ছিল?
- পরীক্ষার সময় ছিল কি? যাতায়াতে সমস্যা ছিল কি?
- ইউনিটে যোগাযোগের সমস্যা ছিল কি?
অর্থাৎ সংখ্যা আমাদের প্রশ্ন করতে সাহায্য করবে, মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করতে নয়।
যে আন্দোলন নিজের ভুল থেকে শেখে না, সে নিজের কাঠামোও উন্নত করতে পারে না।
১৪. শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ
একটি ক্যাম্পাসে ১০০টি ইউনিট ও প্রতি ইউনিটে ৩ জন দায়িত্বশীল ধরলে একটি সক্রিয় যোগাযোগ নেটওয়ার্কে অন্তত ৩০০ জন থাকেন; সাতটি ক্যাম্পাসে ২,১০০ জন। এই মানুষগুলো কোনো আলাদা “বাহিনী” নয়; তারা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী, যারা নিজের সেশন ও সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়েছে।
এখন একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের ঘোষণা হলো। কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচির তারিখ, সময়, স্থান, উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও অংশগ্রহণের পদ্ধতি জানানো হলো; একই সঙ্গে তথ্যটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হলো এবং ইউনিটগুলোকে সরাসরি জানানো হলো। প্রত্যেক ইউনিট নিজেদের সহপাঠীদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেবে। যিনি অংশ নিতে চান, নেবেন; যিনি পারবেন না, তিনি অন্যভাবে সহযোগিতা করতে পারেন।
ঘোষণা তখন শুধু একটি “ঘোষণা” থাকে না; ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত হয় একটি যোগাযোগব্যবস্থা।
১৫. কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হলে কী হবে?
ধরা যাক, সাতটি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের জন্য অভিন্ন বিষয়ে একই দিনে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নেওয়া হলো। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মূল তথ্য তৈরি হবে এবং একই তথ্য একাধিক পথে ছড়াবে:
ওয়েবসাইট → সোশ্যাল মিডিয়া → Messenger/অনলাইন কমিউনিটি → ইউনিট
কেউ সরাসরি সামাজিক মাধ্যম থেকে জানবে, কেউ ইউনিটের দায়িত্বশীলের কাছ থেকে, কেউ ওয়েবসাইটে বিস্তারিত পড়বে। একটি মাধ্যমের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না। কর্মসূচির পর ইউনিটগুলো তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানাবে — এভাবে তথ্য নিচেও যাবে, উপরেও ফিরবে।
১৬. মূল শক্তি: শুধু মানুষ জড়ো করা নয়, একটি স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা
এই কাঠামোর উদ্দেশ্য শুধু একটি কর্মসূচিতে বেশি মানুষ উপস্থিত করা নয়; এর চেয়ে বড় উদ্দেশ্য একটি স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা। আজ স্মারকলিপি হলে এই কাঠামো ব্যবহার করা যাবে; আগামীকাল কোনো একাডেমিক সমস্যা হলেও একই কাঠামো ব্যবহার করা যাবে। কোনো সেশনের সমস্যা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনায় আসতে পারবে; কোনো ক্যাম্পাসের সমস্যা বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের আলোচনায় আসতে পারবে।
কর্মসূচি পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের কাঠামোটি থেকে যেতে পারে। এটাই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মূল্য।
১৭. সেশনভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পাঁচটি সেশনের প্রত্যেকটির নিজস্ব বাস্তবতা থাকতে পারে। নতুন সেশনের সমস্যা হতে পারে একাডেমিক সুবিধা, পরিচয়পত্র, ক্লাসরুম, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা বিভিন্ন শিক্ষাসুবিধা; পুরোনো সেশনের সমস্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই সব সমস্যাকে এক করে ফেলার বদলে দুটি বিষয় আলাদা রাখা দরকার:
- সাধারণ দাবি — যে দাবি পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য।
- নির্দিষ্ট দাবি — যে দাবি কোনো নির্দিষ্ট সেশন, বিভাগ বা ক্যাম্পাসের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পার্থক্য জরুরি, কারণ বড় শিক্ষার্থীসমাজের সাধারণ দাবির ভিড়ে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হারিয়ে যেতে পারে।
১৮. পদ সৃষ্টি নয়, দায়িত্ব বণ্টন
কাঠামো গড়তে গিয়ে একটি সাধারণ ভুল হলো অতিরিক্ত পদ তৈরি করা। পদ যত বাড়ে, ভূমিকার সংঘর্ষ, কর্তৃত্বের প্রশ্ন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
পদ সৃষ্টি নয়, কাজের জন্য দায়িত্ব বণ্টন।
প্রতিটি স্তরে প্রশ্ন করতে হবে: এই স্তরটি কেন দরকার? এর কাজ কী? অন্য স্তরের সঙ্গে সম্পর্ক কী? এটি না থাকলে কী সমস্যা হবে? যে স্তরের বাস্তব প্রয়োজন নেই, শুধু নামের জন্য সেটি তৈরির দরকার নেই। আমরা বড় কাঠামো চাই, কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল কাঠামো নয়।
১৯. প্রস্তাবিত কাঠামোর প্রাথমিক চিত্র
নিচের অ্যানিমেশনে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে কীভাবে পাঁচটি স্তর মিলে শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ গড়ে ওঠে। সবুজ বিন্দুগুলো সেশন ইউনিট; উপরে ওঠার সময় প্রতিটি স্তর নিচের স্তরগুলোকে এক জায়গায় সংযুক্ত করছে।
- শিক্ষার্থী — সবার শুরু এখানেই; প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থী।
- সেশন ইউনিট — একটি বিভাগের একটি সেশন। সংখ্যায় ৭০০টি, প্রতিটিতে ৮০–৯০ জনের মতো শিক্ষার্থী।
- ক্যাম্পাস–সেশন সমন্বয় — একই ক্যাম্পাসের একই সেশনের বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়। ৭টি ক্যাম্পাস × ৫টি সেশন = ৩৫টি; প্রতিটি ২০টি ইউনিটকে সংযুক্ত করে।
- সেশনভিত্তিক কেন্দ্রীয় সমন্বয় — একই সেশনের বিভিন্ন ক্যাম্পাসের প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয়। ৫টি সেশনের প্রতিটির জন্য একটি করে, প্রতিটি ৭টি ক্যাম্পাসকে সংযুক্ত করে।
- শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ — পাঁচটি সেশনের সমন্বিত প্রতিনিধিত্ব।
অ্যানিমেশনের শেষে দ্বিমুখী যোগাযোগ দেখানো হয়েছে। নিচ থেকে একটি মতামত একটিমাত্র পথ ধরে ধাপে ধাপে উপরে পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছায়। আর উপর থেকে তথ্য নামার সময় প্রতিটি পথে ছড়িয়ে পড়ে — প্রতিটি সেশন সমন্বয়, প্রতিটি ক্যাম্পাস–সেশন সমন্বয় হয়ে প্রত্যেকটি ইউনিটে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মতামত একটি আসে, তথ্য সবার কাছে যায়।
এটি কোনো ক্ষমতার সিঁড়ি নয়; এটি মূলত একটি যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। প্রতিটি স্তরের কাজ আলাদা হবে।
২০. আমাদের মূল দর্শন
আমরা এমন ব্যবস্থা চাই না, যেখানে কয়েকজন সব সিদ্ধান্ত নেবে আর বাকিরা অনুসরণ করবে। আমরা এমন শিক্ষার্থী আন্দোলন চাই, যেখানে:
- চিন্তা থাকবে বহু মানুষের;
- মতামত আসবে বহু মানুষের কাছ থেকে;
- সিদ্ধান্ত হবে পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে;
- দায়িত্ব ভাগ হবে;
- তথ্য সংরক্ষিত থাকবে;
- কাজের মূল্যায়ন হবে;
- ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে।
এবং সবশেষে — We are all equal. কারও দায়িত্ব বেশি হতে পারে, কাজের পরিমাণ বেশি হতে পারে, ভূমিকা ভিন্ন হতে পারে — কিন্তু কেউ অন্যের চেয়ে মানুষ হিসেবে বড় নয়।
সমন্বয়ক নেতা নন; সমন্বয়ক একজন দায়িত্বশীল সহপাঠী।
২১. আন্দোলনে প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা হতে পারে
একটি আন্দোলনে সবাই একই কাজ করবে — এমন প্রয়োজন নেই। কেউ মাঠে থাকবে, কেউ তথ্য সংগ্রহ বা গবেষণা করবে, কেউ লিখবে, কেউ গ্রাফিক্স বা ভিডিও বানাবে, কেউ সামাজিক মাধ্যম পরিচালনায় সহযোগিতা করবে, কেউ ওয়েবসাইটে তথ্য সাজাবে, কেউ শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেবে, কেউ আবার শুধু নিজের সেশনের সহপাঠীদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেবে।
সব কাজের গুরুত্ব সমান নয় — এমন কথা নয়; বরং সব কাজের ধরন আলাদা। তাই কেউ শারীরিকভাবে কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে না পারলেও সে আন্দোলনের বাইরে নয়। তার চিন্তা, লেখা, গবেষণা, ডিজাইন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা যোগাযোগের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আমাদের brain and body-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ: কেউ চিন্তা ও পরিকল্পনায় শক্তিশালী, কেউ বাস্তবায়নে, কেউ যোগাযোগে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ সৃজনশীল কাজে। কার্যকর আন্দোলনের জন্য সব ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন।
এখন আলোচনার পালা
ওপরের মূল ধারণাগুলো নিয়ে আশা করি আমরা সবাই বলতে পারি — “হ্যাঁ, এটা করা যায়।” এখন প্রশ্ন, কীভাবে করা যায়। এই কাঠামো এখনো একটি প্রস্তাব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। প্রতিটি ইউনিটে কতজন দায়িত্বশীল থাকবে, তাদের কী নামে ডাকা হবে, প্রতিনিধি কীভাবে নির্ধারিত হবে, সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে — এগুলোতে একেকজনের মত একেক রকম হতে পারে, আর সেটাই স্বাভাবিক।
শেষ কথা
আমাদের সামনে একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় — হাজার হাজার শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ক্যাম্পাস, বিভাগ, সেশন, মতামত ও অভিজ্ঞতা। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। কিন্তু যোগাযোগ না থাকলে শক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর কথা হয়তো পাশের বন্ধুর কাছে পৌঁছাবে; সেখানেই থেমে গেলে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজ জানতেই পারবে না। আবার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নির্ভরযোগ্য পথ না পেলে সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাবে না।
তাই আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে তথ্য নিচে পৌঁছাবে, মতামত উপরে উঠবে, প্রস্তাব আলোচিত হবে, সিদ্ধান্ত পরামর্শের ভিত্তিতে হবে, কর্মসূচি স্বচ্ছভাবে জানানো হবে, অংশগ্রহণ স্বেচ্ছামূলক থাকবে এবং কর্মসূচির পর মূল্যায়ন হবে।
আমরা কোনো সংগঠনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
এই কাঠামো আমাদের পরিচয় পরিবর্তন করবে না; কেউ কারও ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করবে না। এটি শুধু আমাদের পরস্পরের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করবে।
আমরা মানুষের ওপর একটি কাঠামো চাপিয়ে দিতে চাই না। আমরা মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি কাঠামো তৈরি করতে চাই।
কারণ মানুষই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। সেই মানুষগুলোর মধ্যে যদি যোগাযোগ, পরামর্শ, পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলার সক্ষমতা থাকে, তাহলে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু বর্তমান সমস্যার সমাধানেই নয়, একটি উন্নত, জবাবদিহিমূলক ও আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দীর্ঘ যাত্রাতেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
ইচ্ছা আমাদের আছে। দাবিও আমাদের আছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে কেউ নেতা হয়ে উপরে দাঁড়াবে না; বরং সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনের কথা শুনবে, পরামর্শ করবে, দায়িত্ব নেবে এবং প্রয়োজনের সময় একসঙ্গে কাজ করবে।
এটাই হতে পারে আমাদের শিক্ষার্থী ঐক্যের ভিত্তি।